নিউজ ডেস্ক: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (UNGA) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বাংলাদেশি ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। জাতিসংঘের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘Office of the President’-এর কর্মকর্তাদের তালিকায় তার নামের পাশে “Legal Officer – Bangladesh” পদবি উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের ড. খলিলুর রহমান। তিনি ২ জুন ২০২৬ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ৮ সেপ্টেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৮১তম অধিবেশনের মেয়াদ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির কার্যালয়ে বিভিন্ন দায়িত্বে ৪০ জন কর্মকর্তা ও কর্মী রয়েছেন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশেরও একাধিক কর্মকর্তা রয়েছেন। জাইমা রহমান সেখানে আইনি বিষয়ক দায়িত্ব পালন করবেন।
লিগ্যাল অফিসারের কাজ কী?
জাতিসংঘের সভাপতির কার্যালয়ে একজন Legal Officer মূলত অফিসের কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় আইনি পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে থাকেন। বিভিন্ন দাপ্তরিক ও নীতিগত বিষয়ে আইনি কাঠামো, জাতিসংঘের সনদ, সাধারণ পরিষদের বিধি ও প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই করা এ ধরনের দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সভাপতির কার্যালয়ের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথি, চুক্তি, প্রস্তাবনা ও অন্যান্য আইনি বিষয়ের পর্যালোচনাতেও লিগ্যাল অফিসার ভূমিকা রাখতে পারেন। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আইনি গবেষণা, বিশ্লেষণ এবং দাপ্তরিক নথি তৈরিতে সহায়তা করা দায়িত্বের অংশ।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এবং প্রত্যেক রাষ্ট্রের একটি করে ভোট রয়েছে। সাধারণ পরিষদ শান্তি ও নিরাপত্তা, নতুন সদস্য গ্রহণ, জাতিসংঘের বাজেটসহ সনদে অন্তর্ভুক্ত বিস্তৃত আন্তর্জাতিক বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ফলে এর কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামো ও বিধিবিধান বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিতে কাজের সুযোগ
জাতিসংঘের সভাপতির কার্যালয়ে জাইমা রহমানের দায়িত্বের মধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও নীতিগত বিষয়ে আইনগত গবেষণা ও বিশ্লেষণের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, সুশাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক জননীতি, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার, লিঙ্গসমতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির মতো বিষয়ে তার পেশাগত আগ্রহ রয়েছে বলে জাতিসংঘের প্রকাশিত জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা
জাতিসংঘের জীবনী অনুযায়ী, জাইমা রহমান একজন ব্যারিস্টার ও আইন ও নীতিবিষয়ক পেশাজীবী। তিনি যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশ—দুই দেশেই আইন ও নীতিসংক্রান্ত কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
তিনি Queen Mary University of London থেকে Law and Politics বিষয়ে LLB ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ব্যারিস্টার হিসেবে যোগ্যতা অর্জনের জন্য The Honourable Society of the Inner Temple-এর মাধ্যমে Bar-at-Law সম্পন্ন করেন।
তার পেশাগত অভিজ্ঞতার মধ্যে যুক্তরাজ্যে housing, welfare ও employment law এবং বাংলাদেশে healthcare sector-এ legal advisory ও public relations-এর কাজ রয়েছে। এছাড়া সামাজিক কল্যাণ ও শিক্ষা-সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি pro bono কাজও করেছেন। বাংলাদেশে তিনি Syed Ishtiaq Ahmed & Associates-এর সঙ্গে constitutional, corporate and commercial law, public-private partnerships এবং taxation-সংক্রান্ত কাজেও যুক্ত ছিলেন।
জাইমা রহমান বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান সুরভি (Surovi)-এর বোর্ডেও দায়িত্ব পালন করছেন বলে জাতিসংঘের প্রকাশিত জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সুবিধাবঞ্চিত ও স্কুলের বাইরে থাকা শিশুদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে কাজ করে।
বাংলাদেশের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা
জাতিসংঘের সভাপতির কার্যালয়ে জাইমা রহমান ছাড়াও বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে আব্দুল আলীমকে Deputy Chief of Cabinet, মোয়াজ্জেম হোসেনকে Adviser and Administrative Assistant, মফিজুল ইসলামকে Senior Adviser for Information, Artificial Intelligence and Strategic Foresight, জাকির আহমেদকে Senior Adviser for Sustainable Development and Climate Change এবং মো. রফিকুল আলম মোল্লাকে Senior Adviser on Least Developed Countries হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাইমা রহমানের দেশে ফেরা
২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাবা তারেক রহমান ও মা ডা. জুবাইদা রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশে ফেরেন জাইমা রহমান। পরিবারটি লন্ডন থেকে ঢাকায় আসে এবং সেদিনই দেশে ফেরার বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়।
এদিকে ২০২৬ সালের জুনে জাইমা রহমান বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট পরীক্ষার প্রথম ধাপ পাস করেছেন বলেও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে নতুন অধিবেশন
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য—“Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All”। ২ জুন নির্বাচিত হওয়ার পর খলিলুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের বক্তব্যে আস্থা পুনর্গঠন, ঐকমত্য তৈরি এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে গঠনমূলক আলোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
৮ সেপ্টেম্বর অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যেও তিনি জাতিসংঘের প্রতি আস্থা পুনর্গঠন ও প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের সভাপতির কার্যালয়ে জাইমা রহমানের লিগ্যাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ তার আইন ও নীতিবিষয়ক পেশাগত ক্যারিয়ারের একটি নতুন আন্তর্জাতিক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।









