, ,
, ,

এ সম্পর্কিত আরও খবর

স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রার্থী বাছাইয়ে ৫-পাঁচ মানদণ্ডে গুরুত্ব বিএনপির

স্টাফ রিপোর্টার: আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক রোডম্যাপ এখনো ঘোষণা হয়নি। তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক প্রস্তুতিতে আগেভাগেই মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় প্রতীক না থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিটি এলাকায় একক ও বিজয়ী হওয়ার মতো প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার লক্ষ্যে তৃণমূল পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ, মতামত গ্রহণ ও যাচাই-বাছাই শুরু করেছে দলটি।

প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিএনপি মূলত পাঁচটি মানদণ্ডকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এগুলো হলো—ক্লিন ইমেজ, স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা, দলের প্রতি ত্যাগ ও অবদান, নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা এবং দলের প্রতি কমিটমেন্ট বা সাংগঠনিক আনুগত্য।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি মহানগর, জেলা, উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক অনলাইন ‘জুম মিটিং’-এর মাধ্যমে প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয়ে প্রাথমিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব বৈঠকে তৃণমূল নেতাদের স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা, সম্ভাব্য প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক ভূমিকা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পাঁচ মানদণ্ডেই নজর

বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের দেওয়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শুধু দলের দীর্ঘদিনের কর্মী হলেই প্রার্থী হিসেবে সমর্থন পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে না। একইভাবে কারও আর্থিক সক্ষমতা বেশি কিংবা এলাকায় প্রভাব রয়েছে—এটিও একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হবে না।

প্রার্থী বাছাইয়ে প্রথমেই দেখা হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্লিন ইমেজ ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা। এরপর স্থানীয় জনগণের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড, দলের দুঃসময়ে ভূমিকা এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অবদান মূল্যায়ন করা হবে।

এর পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হবে—তিনি নির্বাচনে বাস্তবে বিজয়ী হতে পারবেন কি না।

দলের নেতারা তৃণমূলকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এমন কাউকে শুধু দলীয় আনুগত্যের কারণে সমর্থন দেওয়া হবে না, যার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কম কিংবা ভোটে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা দুর্বল। আবার কোনো ব্যক্তি দলের জন্য তুলনামূলক কম সময় বা ত্যাগ স্বীকার করলেও যদি এলাকায় তার ব্যাপক জনসমর্থন, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচনে বিজয়ের বাস্তব সম্ভাবনা থাকে, তাকেও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

দলের বাইরের গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরাও বিবেচনায়

দলীয় নেতাদের ভাষ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন মূলত ব্যক্তি ও স্থানীয় জনপ্রিয়তানির্ভর হওয়ায় প্রার্থী বাছাইয়ে বাস্তব জনসমর্থনকে উপেক্ষা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।

তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সমর্থন ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। জনগণের সঙ্গে প্রার্থীর সম্পৃক্ততা, স্থানীয় পর্যায়ে তার গ্রহণযোগ্যতা এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সমর্থনের বিষয় বিবেচনায় নিয়েই প্রার্থী বাছাই করা হবে।

তিনি জানান, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের নেতারা সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই করে যোগ্য ব্যক্তিকে স্থানীয় নির্বাচনে সমর্থনের জন্য সুপারিশ করবেন।

৪-চার সদস্যের বিশেষ কমিটি

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন-সংক্রান্ত প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. ইসমাঈল জবিউল্লাহ এবং বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে কমিটির পরিধি আরও বাড়ানো হতে পারে।

সূত্র জানায়, গুলশানের দলীয় কার্যালয় থেকে কমিটির সদস্যরা বিভিন্ন মহানগর, জেলা, উপজেলা ও পৌরসভার শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করছেন। এসব বৈঠকে স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সাংগঠনিক শক্তি, সম্ভাব্য প্রার্থী এবং নির্বাচনে বিএনপির অবস্থান সম্পর্কে তথ্য নেওয়া হচ্ছে।

ইতোমধ্যে কয়েকটি বিভাগের নেতাদের সঙ্গে এ ধরনের মতবিনিময় হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিভাগের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করার প্রস্তুতি রয়েছে।

ধাপে ধাপে প্রার্থী বাছাই

বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে প্রথমে উপজেলা বিএনপি স্থানীয় পর্যায়ের মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থীদের নাম জেলা কমিটির কাছে সুপারিশ করবে। জেলা কমিটি প্রার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয়, সাংগঠনিক ভূমিকা, জনপ্রিয়তা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও নির্বাচনী সক্ষমতা যাচাই করবে।

এরপর সুপারিশ করা তালিকা বিভাগীয় পর্যায়ে পাঠানো হবে। কোনো পর্যায়ে অনিয়ম, অসংগতি, বিরোধ বা বিতর্ক দেখা দিলে বিভাগীয় টিম তা পর্যালোচনা করবে। প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করা হবে।

দলের লক্ষ্য হচ্ছে—প্রার্থী বাছাইয়ের পুরো প্রক্রিয়াটি যেন স্থানীয় পর্যায়ের বাস্তব তথ্য ও একাধিক স্তরের যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়।

বিকল্প প্রার্থী রাখার কৌশল

কোনো কোনো এলাকায় প্রার্থিতা নিয়ে আইনি বা নির্বাচনী জটিলতার আশঙ্কা থাকলে বিকল্প প্রার্থী রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে একই এলাকায় একাধিক ব্যক্তি মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেন। যাচাই-বাছাই শেষে মূল প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হলে বিকল্প প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেবেন।

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, বিকল্প প্রার্থী রাখা একটি স্বাভাবিক ও গঠনমূলক রাজনৈতিক কৌশল। কোনো কারণে একজন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হলে যাতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় দল সমর্থিত প্রার্থীশূন্যতা তৈরি না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনা করেই কোথাও কোথাও একাধিক প্রার্থী রাখা হতে পারে।

শুধু অর্থবল নয়, দরকার ভোটের শক্তি

দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের দেওয়া নির্দেশনায় আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে—অর্থনৈতিক সামর্থ্যকে প্রার্থী হওয়ার প্রধান যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা না করা।

দলীয় নেতাদের মতে, কোনো সম্ভাব্য প্রার্থীর আর্থিক অবস্থা ভালো হলেও যদি সাধারণ ভোটারের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা কম থাকে বা নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে শুধু অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে তাকে দলীয় সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে না।

অন্যদিকে, কোনো প্রার্থী আর্থিকভাবে তুলনামূলক দুর্বল হলেও যদি তিনি সৎ, যোগ্য, জনপ্রিয়, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং ভোটে জয়ী হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রাখেন, তাহলে তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে।

দলীয় নেতাদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের ত্যাগ অবশ্যই মূল্যায়ন করা হবে। একই সঙ্গে জনগণের ভোটে জয়ী হওয়ার সক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

অভ্যন্তরীণ বিরোধ কমানোর নির্দেশ

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির তৃণমূল নেতাদের মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে যাতে বিভক্তি তৈরি না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।

জুম মিটিংয়ে নেতাদের বলা হয়েছে, প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, গ্রুপিং কিংবা অভ্যন্তরীণ বিরোধ যেন প্রভাব না ফেলে। নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্যায়ে দল যাকে সমর্থন দেবে, তার পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

একই সঙ্গে নির্বাচনের আগে ও পরে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো নেতাকর্মী অন্যায় বা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ালে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

মাঠ জরিপে গুরুত্ব

প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে দল থেকে গোপনীয় জরিপ,ও সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও জনমত যাচাইয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের সমন্বয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে সাধারণ ভোটার, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং দলীয় নেতাকর্মীদের মতামত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এসব তথ্য পর্যালোচনা করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা জেলা পর্যায়ে জমা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। কোনো বিষয়ে মতবিরোধ বা জটিলতা দেখা দিলে তা বিভাগীয় টিম ও কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতাদের জানাতে বলা হয়েছে।

চট্টগ্রামে বিশেষ কমিটি

জুম মিটিংয়ের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ের জন্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে কয়েকটি উপজেলায় বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

আনোয়ারা, সাতকানিয়া, কর্ণফুলী, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বোয়ালখালী উপজেলায় এসব কমিটি স্থানীয় সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শের পাশাপাশি সাধারণ জনগণ ও দলীয় নেতাকর্মীদের মতামত সংগ্রহ করবে। পরে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে জেলা পর্যায়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।

‘যোগ্য ও বিজয়ী প্রার্থীই অগ্রাধিকার’

বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের মূল লক্ষ্য হচ্ছে যোগ্য, জনপ্রিয়, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির এবং জনগণের ভোটে বিজয়ী হওয়ার মতো প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া।

দলীয় নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রার্থীর দলীয় পরিচয় পদ-পদবি আমলে যেমন নেওয়া হবে এবং জনগণের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা, দলের প্রতি আনুগত্য, দীর্ঘদিনের অবদান, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এবং নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সক্ষমতা—সবকিছু মিলিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এতে একদিকে যেমন ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করার সুযোগ থাকবে, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদেরও নির্বাচনী মাঠে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে।
দলের নেতারা মনে করছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাংগঠনিক ঐক্য, শক্তিশালী প্রার্থী, জনসম্পৃক্ততা এবং সুষ্ঠু প্রার্থী বাছাই নিশ্চিত করা গেলে তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপি ভালো ফল করতে সক্ষম হবে।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Payment Due

Clear Your Payment for Accessing Control

Contact wephic for More Details